আজগুবি

পারমিতা কাঁদছে। ডাক ছেড়ে, বুক চাবড়ে চাবড়ে কাঁদছে। ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনের অকালপ্রয়াণে,বাঁধভাঙা শোকে মানুষ যেমনি করে কাঁদে,অনেকটা তার কাছাকাছি। কান্নার দমকে হিলহিলে সাপের মতন শরীরটায়, মৃদু হিল্লোল উঠেছে। শিরদাঁড়া বেঁকে নুয়ে পড়েছে বিছানায়। এলো হাতখোঁপাটি খুলে অগোছালো চুলের প্রান্ত সরু কোমর ছাপিয়ে খাট থেকে মাটিতে গিয়ে মিশেছে। বাদামি সুন্দর দুটি গালের চামড়ার তলা থেকে ডালিমের মতন লালচে আভা;নাকের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম আর কেঁদে কেঁদে পাটা দুটো বিশ্রীরকম ফুলে ওঠায়,নাকটাকে আরোও খাঁদা লাগছে।

হঠাৎ সেই সুপরিচিত রিংটোন~
‘সারাটাদিন ঘিরে আছ তুমি এত রঙিন’ ওরই গাওয়া। ওর গলায় সা রে গা মা পা ধা নি এই সাতটি সুর যেন খলবলিয়ে খেলা করে। গান গেয়ে গেয়ে মাঝে মাঝে নুপূরের ছন্দে ছুমছুমিয়ে নাচে। রাঘব কিনে দিয়েছিল,চাঁদের হাট থেকে।ওর নাচ দেখতে রাঘব বড্ড ভালোবাসে।

রাঘব!

অন্য সময় হ’লে হয়তো ফোন পেয়ে লাল টুসটুস ঠোঁটের এধার থেকে ওধার মিষ্টি হাসির ঝিলিক খেলত। বুকে উঠত বেশ একটা তিরতিরে কাঁপন। বেছে বেছে সবচেয়ে পছন্দের এই গানটা সিলেক্ট করেছিল তো ও।

কিন্তু এখন পারো কান্নার মুডে আছে তাই সেসব কিছুই হ’ল না। হুঁহ্ কত্ত রং গো! সব জানা আছে। হাড়েহাড়ে চিনে ফেলেছে অমানুষটাকে। ও ফোনটা ঘ্যাঁচ করে কেটে দিল।

সারাটাদিন….

ধ্যের বাবা, এই নিয়ে বোধহয় সতেরবার হ’ল। মহারানী যে কখন কোন খুশি মনে থাকেন কিছুই বোধগম্য হয় না রঘুর। এই ভালো তো এই খারাপ।
সগ্গের নেটওয়ার্ক যে সবসময় ভালো থাকে না সেটা রাঘবকে বোঝানো বেশ শক্ত। ও রঘুকে প্রেম প্রক্সির ভার দিয়ে বেশ নিশ্চিন্তেই আছে। ব্যাটা পাকাল মাছের মতন। বেজায় চালাক। বোধহয় বুঝেও না বোঝার ভান করে। রঘু ভাবে। প্রত্যেকটাদিন তো ওই একই বোয়াল মাছের কারি খাবে আর ভোঁসভোঁস করে ঘুমোবে। আর ও ব্যাটা যে ঘোরতর জাতিস্মর হবে তা কী ঘুণাক্ষরেও আঁচ কত্তে পেরেছিল রঘু! নইলে কবেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে সগ্গো থেকে পগারপার হ’ত।
চুনোপুঁটি পেয়ে রঘুকে দিয়ে যত রাজ্যের আজেবাজে কাজ করিয়ে নিতে কসুর করে না রাঘব। মায় প্রেমিকার মানভঞ্জন অবধি। সগ্গের দরজা পেরিয়ে মর্তে বেড়াতে এসেছিল রঘু। রাঘবকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ।পরে বুঝল ওটা ওরই বর্তমান। সেই থেকে অতীত আর বর্তমান পাল্টাপাল্টি করে মিলেমিশে থাকে। তবে রাঘবের গায়ের জোর বেশি আর কে না জানে জোর যার,সবকিছু তার। তাই রঘু বিশেষ সুবিধে কত্তে পারে না। মাঝেমধ্যে অবশ্য ইচ্ছে করে সুপার পাওয়ার দিয়ে রাঘবকে ভস্মটস্ম করার। তবে শিব ঠাকুরের আপন দেশের আইনকানুন তো! ওসব বড্ড সর্বনেশে!

পেথ্থম পেথ্থম একটু বাধো বাধো লাগলেও পারোকে রঘুর এখন ভারী পছন্দ। এই তো শিবরাত্তিতে ভোলেবাবার শিবিরে গিয়ে পারোকেই ওর ‘পার্বতী’ করার জন্যে কতই মিনতি করে এল।তা উনি শুনলে তো। নাইট-পার্টিতে উনি তো আবার কান শুনতে ধান শোনেন। ফোনালাপ আর ও চায় না। ও পারমিতাকে চায়।

এটাওটা ভাবতে ভাবতে রঘু যখন বাবার থানে গিয়ে পৌঁছল,তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। সূর্যদেব মেঘের আড়ালে ঢুকে পাওয়ার ন্যাপ নিচ্ছেন। গণেশ আর কাত্তিক লুকোচুরি খেলছে। দুর্গা, সরস্বতী লক্ষ্মী সবাই গেছে শপিংয়ে।

-বাবা, বাবা গো!
কঁকিয়ে উঠল রঘু।
-বাবা, পারো!
-হ্যাঁ, হয়তো পারি!কিন্তু কী সেটা তো বলো।

ঝিমুনি ভেঙে উঠে স্মিত হেসে বললেন শিব।

-পারমিতা। পারমিতাকেই চাই আমার বাবা! ও ব্যাটা রঘু, রঘু জানলে যে…

-ও নন্দী! যাও তো বাছা বৌমাকে নিয়ে এসো তো যাও। ও তৈরি তো?
-ইয়ে বাবা, রঘুকেই যদি ওখানে আবার পার্মানেন্টলি?
-কেন বলো তো?
-না, মানে রাঘবের কৌটোভত্তি অ্যালজোলাম একটু আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছে কি না! চিত্রকে তো এই বেরুতেও দেখলাম।
-অ্যাঁ?!
-আজ্ঞে, হ্যাঁ!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s