✨আলো ✨

মিট্টি লেবে গোওওওও মিট্টি…মিট্টি লেবে গো…হাঁক পাড়তে পাড়তে মাথার ওপরের ঝাঁকাটাকে দু’হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে ফুলি। কেউ যদি প্রদীপ বানাতে মাটি কেনে!
আর দিন তিনেক পরেই দেওয়ালি। আলোর উৎসব।  বড়লোক বাবুরা সব বাড়িতে আলো দেবে । মস্ত মস্ত বাড়িগুলো সাঁঝের বেলায় আলোয় ঝলমল করবে। এসময়ই তো মাটির চাহিদা সবচাইতে বেশি। মায়ের পিছু পিছু মাটির ঝাঁকা নিয়ে বড় রাস্তার দিকে হেঁটে চলল ফুলি।গন্তব্য অজন্তা শিল্পালয়। আজ অনেক আশা মনে ওর। এই মাটি বিক্রির টাকা থেকে হয়তো ওর একটা নতুন জামা হবে। একটু মিষ্টি খেতে পারবে। জিলিপি খেতে খুব ভালোবাসে ফুলি। হাঁ করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোজ খগেন কাকুকে জিলিপি ভাজতে দ্যাখে ও। পয়সার অভাবে কিনে খেতে পারে না। পুজোর দিনে মাকে বললে হয়তো মা কিনে দেবে। ভাবতে ভাবতে আনন্দে ওর চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে।
ফুলিরা রেলবস্তির কলোনিতে মামা-মামীর সাথে থাকে। ওর বাবা নেই। মামা রেলের গ্রুপ-ডি কর্মী। ওই বাড়িতে একখানা মোটে শোবার ঘর। মামা-মামী থাকে। বারান্দার এককোণে কোনোমতে মা-মেয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পেয়েছে। তাও দু’বেলা মাকে মামা-মামীর গালমন্দ শুনতে হয়।ও লুকিয়ে লুকিয়ে ওর মাকে কাঁদতে দেখে। বড্ড কষ্ট হয় ফুলির। রাগও হয় খুব। কিন্তু ও অসহায়। দুর্বল আর ভীতু। কার কাছে নালিশ করবে ও ?  কবে যে ও বড় হবে! তখন ঠিক ও ওর মায়ের কষ্ট দূর করবে। 

এবারে দুগ্গাপুজোর আগ দিয়ে যে বন্যা হল তাতে যে কত্ত ফসল নষ্ট হল তা আর বলার নয়,খেতখামার,বাড়িঘর,দোকানপাট সবই তো অদ্ধেক জলের তলে।ঘরের মধ্যেও তো তা প্রায় কোমর সমান জল দাঁড়িয়ে ছিল।আর  বারান্দাটা ভেসে গেছিল। রেলের ব্রিজ ভেঙে পড়ল। বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হল আর কী! তাই পুজোতে তো আর ত্যামন জাঁক হল না। তারপর পুজোর আগ দিয়ে মায়ের মশার কামড়ে ডেঙ্গি না কী জানি হল, কী রুগ্নটাই না হয়ে গেছিল মা! ওদের কলোনির অনেকেরই হয়েছিল। সবাই হসপিটালে ভর্তি হল।তবুও দু’বেলা মামা শাপশাপান্ত করত ফুলিকে। পরে অবশ্যি মা ভালো হয়েই ফিরেছে। দুর্গাপুজোর দিনগুলো তাই বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে কেটেছে ফুলির। ও আশায় আশায় ছিল কবে কালীপুজো আসবে। সব অন্ধকার দুঃখ কষ্ট কেটে আলোর উৎসবে মাতবে সবাই।
শিল্পালয়ে পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় বিকেল হয়ে এল। পশ্চিম আকাশে সুয্যি-ভাসান হবে হবে। লালচে-কমলা আলোয় সারা আকাশ ছেয়ে গেছে। খানিক হাঁকাহাঁকিতেই দীনুদাদা ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন। চোখে ডাঁটিভাঙা পুরু চশমা। কাঁপা-কাঁপা হাত। শরীরটা ‘দ’ এর মতন বেঁকে গিয়েছে। বয়স প্রায় আশির কোঠায়। মৃৎশিল্পী। মায়ের মূর্তি গড়েন। সঙ্গে মাটির প্রদীপও। একা মানুষ। বিয়ে-থা করেন নি।তবে ইদানীং বয়সের ভারে আর পেরে ওঠেন না সামাল দিতে সবদিক।

ফুলিরা এসে বুড়োকে মাটির জোগান দিয়ে যায়। 
-এবারের বাজার খুব খারাপ মা রে। বিজলি বাতি পিদিমেরে খায় ফেলি দিলো। ঘোষবাড়ির কত্তামশাই এবারে আর অডারই দিলে না। সারা বাড়ি নাকি ‘টুনি’ দিয়ে সাজানো হবে শুনলাম। সে তখন ছিল বড়কত্তাবাবুর আমল।মায়ের পুজোয় সারাবাড়ি পিদ্দিমের আলোয় ঝলমল কত্ত। দূর-দূর থেকে ছেলেপুলেরা এসে ভিড় জমাত। 

কতো আলোর রোশনাই…বাজি…রংমশাল..শুনছি নাকি এই শিল্পালয়টাও উঠিয়ে দিতে হবে পুজোর পর পরই। এ জমি নাকি বিক্কির…
কথাগুলো একনাগাড়ে শুনতে শুনতে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছিল ফুলির মুখ। এবার ও ভ্যাঁ করে কেঁদেই ফেলল। গলার কাছে যে নরম কষ্টটা তুলোর মতন দলা পাকিয়ে আটকে ছিল, চোখের জলে তা মুক্তি পেল।
এ জমি বিক্কির হবে না দীনুদাদা কিছুতেই হবে না। পিদিমের আলো জ্বলবে, ঘরে ঘরে জ্বলবে। 

বলে দুপদাপ করে দৌড়ে গিয়ে কোথ্থেকে একখানা পুরোনো কালিমাখা প্রদীপ জোগাড় করে দেশলাই কাঠির বাক্স থেকে কাঠি বের করে ফস্ করে আলো জ্বালালো ফুলি। 
সেই আলোয় উদ্ভাসিত ফুলির মুখ দেখে মনে হয় শ্যামা মা-ই বুঝি এলেন ফুলির বেশে। 
মা, মা গো,  দীনদুখিনী দয়াবতী মা,মঙ্গল করো মা। মঙ্গল কর।
বিড়বিড় করতে করতে আবেগে ছলোছলো চোখে আকাশের দিকে মুখ তুলে হাত জোড় করে নমস্কার করলে বুড়ো।
তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। আকাশে একটা-দুটো করে তারা ফুটতে লেগেছে। ফুলির মা দৌড়ে বুড়োর ঘরে ঢুকে পুজোর আসন থেকে শাঁখ বের করে গুনে গুনে তিনবার ফুঁ দিল…
                                        -তৃষিতা ‘১৭
◆◆◆
[ বিজলিবাতির দাপটে মাটির প্রদীপ এখন প্রায় কোণঠাসা। সকলের কাছে তাই অনুরোধ এই দীপাবলির উৎসবে মাটির তৈরি প্রদীপকেও সামিল করুন। 
আলোয় থাকুন।ভালো থাকুন। 🙂 ]

Advertisements

2 thoughts on “✨আলো ✨”

  1. আমাদের বাড়িতে এখনো মাটির প্রদীপ দেওয়া হয়, ওটির একটা আলাদা অভিজাত্য রয়েছে! ভাল লাগল লেখাতি পড়ে!

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s